জ্বালানি খাতের অস্থিরতায় বিনিয়োগ বাড়ছে বায়োফুয়েলে

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় এবার বায়োফুয়েল তৈরিতে ব্যবহৃত কৃষিপণ্যে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে হেজ ফান্ডগুলো।

বিশেষ করে সয়াবিন তেল, ভুট্টা ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেলের বাজারে বড় ধরনের অবস্থান নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। খবর এফটি।

উল্লেখ্য, হেজ ফান্ড হলো ধনী ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে গঠিত একটি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ তহবিল। বিভিন্ন গ্রাহকের বিনিয়োগকৃত মোট অর্থকে এমনভাবে বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করা হয়, যাতে স্বল্পতম সময়ে দ্রুত মুনাফা অর্জন করা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তেল ও গ্যাস পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিকল্প জ্বালানির বাজারেও।

বায়োফুয়েল বা জৈব জ্বালানি মূলত উদ্ভিদ, কৃষি বর্জ্য, শৈবাল বা প্রাণিজ উপাদান (যাকে বায়োমাস বলা হয়) থেকে উৎপাদিত এক ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এটি সাধারণত পেট্রল বা ডিজেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হয় ও জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম কার্বন নিঃসরণ করে বলে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গণ্য হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচারস ট্রেডিং কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে সয়াবিন তেলে হেজ ফান্ডগুলোর নিট বিনিয়োগ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এ তেল মূলত বায়োডিজেল তৈরিতে ব্যবহার হয়। একই সঙ্গে ইথানল উৎপাদনে ব্যবহৃত ভুট্টার বাজারেও অবস্থান বদলেছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তেলের বাজারে বড় উল্লম্ফনের পর অনেক বিনিয়োগকারী এখন কৃষিপণ্যের বাজারকে পরবর্তী সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে বিকল্প জ্বালানির চাহিদাও বাড়ে। এতে ভুট্টা, আখ, সয়াবিন তেল ও ক্যানোলার মতো কৃষিপণ্যের ব্যবহার বাড়ে।

কমোডিটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আরসিএমএ ক্যাপিটালের প্রধান ডগ কিং জানান, সয়াবিন তেলের বাজারে হেজ ফান্ডগুলো খুব দ্রুত প্রবেশ করছে। তার ভাষায়, এটি ধীরে ধীরে হওয়া পরিবর্তন নয়, বরং এক ধরনের ঝড়ের গতির বিনিয়োগ প্রবাহ।

তিনি জানান, তেলের ধাক্কার পর সরকারগুলো যেন স্থানীয়ভাবে বায়োফুয়েল উৎপাদন বাড়াতে পারে সে প্রত্যাশা থেকেই ফান্ডগুলো সয়াবিন তেলের দিকে ঝুঁকছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য শুধু বায়োফুয়েলের চাহিদাই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। কারণ কৃষিকাজ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহনের বড় অংশ জ্বালানিনির্ভর। ফলে ডিজেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদনের খরচও বাড়ে।

এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সার বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য এ পথ দিয়ে হতো।

বিশ্বের অন্যতম বড় কৃষিপণ্য প্রতিষ্ঠান আর্চার-ড্যানিয়েলস-মিডল্যান্ড গত সপ্তাহে বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জুয়ান লুসিয়ানো জানান, যুক্তরাষ্ট্রে জৈব জ্বালানির বাধ্যবাধকতা বাড়ায় সয়াবিন মাড়াই এবং ইথানল উৎপাদন থেকে মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতির একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বর্তমান সংকটটি আসলে ফসলের সংকট নয়, বরং জ্বালানি তেলের সংকট। কিন্তু শস্যকে খাদ্যের বদলে জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা শুরু হলেই আসল বিপদ ঘনীভূত হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করেছে, জৈব জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার আসন্ন খাদ্য সংকটকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে তার বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে।

জুয়ান লুসিয়ানো জানান, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে সয়াবিন সরবরাহ নিয়েও বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও রাসায়নিকের উচ্চমূল্য কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ধীরে ধীরে খাদ্য, কৃষি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে আগামী মাসগুলোয় কৃষিপণ্যের বাজার আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে।

আরও